সজল সরকার
শনিবার, ২৮ মার্চ ২০২৬ প্রিন্ট
বিশ্বের অর্থনীতি একাধিক বড় শহরের ওপর নির্ভর করে। যদিও দেশের অর্থনীতি জিডিপি, রপ্তানি‑আমদানি, শিল্প ও প্রযুক্তি‑ভিত্তিক নানা বিষয়ের সমন্বয়ে গঠিত, তবু একটি শহর যদি তার নিজস্ব অর্থনৈতিক উৎপাদন ও কার্যক্রমে শক্তিশালী হয়, তা তাকে বিশ্বমানের ‘ধনী শহর’ হিসেবে চিহ্নিত করে। সাধারণভাবে কোনো শহরের ধনীর পরিমাপ করা হয় সকল পণ্য ও সেবা উৎপাদনের মোট অর্থনৈতিক মান বা জিডিপি দিয়ে যা একটি শহরের অর্থনৈতিক শক্তি ও সম্ভাবনার মূল সূচক।
২০২৫‑২৬ সালের তথ্যমতে বিশ্বের শীর্ষ ১০ ধনী শহর নিয়ে বিশদভাবে তুলে ধরা হলো:
১. টোকিও (জাপান): টোকিও আবারও বিশ্বের সবচেয়ে ধনী শহর হিসেবে শীর্ষে রয়েছে। এ শহরের মোট বার্ষিক জিডিপি প্রায় ১,৫২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং এর অর্থনীতি জাপানের জাতীয় উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। টোকিওতে রয়েছে আন্তর্জাতিক ব্যাংক, প্রযুক্তি কোম্পানি এবং উৎপাদনশীল শিল্পের ঘনত্ব, যা এটিকে আর্থিক শক্তিশালী করে তুলেছে। শহরটি শুধু জাপানের নয়, এশিয়ার এক অন্যতম অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবেও বিবেচিত হয়। টোকিওর অর্থনৈতিক শক্তি উৎপাদন, প্রযুক্তি, ব্যাংকিং এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসার সমন্বয়ে গঠিত। এখানে স্থাপিত অনেক বহুজাতিক কোম্পানির সদর দপ্তর রয়েছে এবং বিশ্বের বিভিন্ন বাজারের সাথে সরাসরি সংযোগ টোকিওকে একটি গ্লোবাল অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
২. নিউইয়র্ক সিটি (যুক্তরাষ্ট্র): দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শহর নিউইয়র্ক সিটি, যার মোট জিডিপি প্রায় ১,২১০ বিলিয়ন ডলার। নিউইয়র্ককে প্রথাগতভাবে “বিশ্বের আর্থিক রাজধানী” বলা হয়, কারণ ধনসম্পদ, ব্যাংকিং, বিনিয়োগ, শিল্প, মিডিয়া ও ব্যবসার কেন্দ্র হিসেবে এর গুরুত্ব অপরিসীম। এখানে ওয়াল স্ট্রিট, নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জ (ঘণঝঊ) ও অনেক শীর্ষস্থানীয় কর্পোরেটের সদর দপ্তর রয়েছে যা বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগ ও আর্থিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।
নিউইয়র্কের অর্থনৈতিক পরিধি শুধু আর্থিক খাতে সীমাবদ্ধ নয়; মিডিয়া, বিনোদন, রিয়েল এস্টেট এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর ফলে শহরটি প্রতিনিয়ত বৈশ্বিক আকর্ষণের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে।
৩. লস অ্যাঞ্জেলস (যুক্তরাষ্ট্র): তৃতীয় স্থানে রয়েছে লস অ্যাঞ্জেলস, যেখানে মোট জিডিপি প্রায় ৭৮৯ বিলিয়ন ডলার। এই শহর বিশ্বের বিনোদন ও চলচ্চিত্র শিল্পের প্রাণকেন্দ্রÑবিশেষ করে হলিউডÑএবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বন্দর কার্যক্রমের জন্য বিখ্যাত।
লস অ্যাঞ্জেলসের অর্থনীতি শুধু বিনোদন শিল্পেই সীমাবদ্ধ নয়; রিয়েল এস্টেট, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, পরিবহন, প্রযুক্তি ও স্বাধীন পেশাগত সেবা খাতগুলোও এখানে ব্যাপক অবদান রাখে।
৪. সিয়ল (দক্ষিণ কোরিয়া): চতুর্থ ধনী শহর হিসেবে রয়েছে সিয়ল (দক্ষিণ কোরিয়া), যার মোট জিডিপি প্রায় ৭৭৯ বিলিয়ন ডলার। সিয়ল নাগরিক প্রযুক্তি, ইলেকট্রনিক্স, অটোমোবাইল ও বৈজ্ঞানিক গবেষণায় অগ্রণী শহর। সেখানে ঝধসংঁহম, খএ ও ঐুঁহফধর এর মতো বিশ্বখ্যাত কোম্পানির কার্যক্রম ধনী অর্থনৈতিক কাঠামোর অংশ।
সিয়লের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির পেছনে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের ভূমিকাই সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে, যা এটিকে এশিয়ার অন্যতম আধুনিক শহরে পরিণত করেছে।
৫. লন্ডন (যুক্তরাজ্য): ইউরোপের আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত লন্ডন শহরটি দেশের অর্থনৈতিক শক্তির প্রধান স্তম্ভ। এর জিডিপি প্রায় ৭৩১ বিলিয়ন ডলার এবং এটি ব্যাংকিং, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিমা ও পুঁজিবাজারের জন্য বিশাল ভূমিকা পালন করে।
লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ, আন্তর্জাতিক ব্যাংক ও বহু কর্পোরেট সদর দপ্তর এখানে অবস্থিত। যদিও সাম্প্রতিক কিছু বছর ধরে অনেকে লন্ডন থেকে সরে যাওয়ার প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে, তবুও এটি ইউরোপের এক অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে রয়ে গেছে।
৬. প্যারিস (ফ্রান্স): ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস শহরটি ধনী শহরগুলোর তালিকায় ষষ্ঠ অবস্থানে রয়েছে, যার মোট জিডিপি প্রায় ৬৬৯ বিলিয়ন ডলার। প্যারিস সেবা খাত, ফ্যাশন, বিলাসিতা পণ্য, টুরিজম এবং ব্যাংকিং খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এ শহর বিশ্বের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র, যেখানে প্রতিনিয়ত আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও অর্থনৈতিক বিনিময় ঘটে। এতে শিল্পভিত্তিক কর্মসংস্থান ও বৈশ্বিক বিনিয়োগের পরিধি আরো বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।
৭. ওসাকা (জাপান): জাপানের আরেকটি অর্থনৈতিক শক্তিশালী শহর ওসাকা, যার মোট জিডিপি প্রায় ৬৫৪ বিলিয়ন ডলার। ওসাকা কেবল একটি বাণিজ্য কেন্দ্রই নয়; এটি শিল্প উৎপাদন, পরিসেবা খাত ও গবেষণাতে সমৃদ্ধ শহর।
ওসাকার অর্থনৈতিক ভূমিকা জাপানের অভ্যন্তরীণ বাজারে বড় অবদান রাখে এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসার সঙ্গে এর শক্তিশালী সংযোগ বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক শৃঙ্খলের অংশ।
৮. শিকাগো (যুক্তরাষ্ট্র): শিকাগো যুক্তরাষ্ট্রের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনৈতিক শহর। এ শহরের মোট জিডিপি প্রায় ৫২৪ বিলিয়ন ডলার। ব্যাংকিং, বিমা, ট্রেডিং ও উৎপাদন এখানে ভালভাবে মিলিত হয়েছে। শিকাগো অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী একটি কেন্দ্র যেখানে বহু আন্তর্জাতিক কোম্পানি, বাণিজ্য কেন্দ্র এবং অবকাঠামোগত বিনিয়োগ রয়েছে।
৯. মস্কো (রাশিয়া): রাশিয়ার রাজধানী মস্কো শহরটি প্রায় ৫২০ বিলিয়ন ডলার জিডিপির সাথে বিশ্বের ধনী শহরগুলোর মধ্যে রয়েছে। এখানে শক্তিশালী শক্তি, খনিজ ও অবকাঠামো খাতের ওপর ভিত্তি করে অর্থনৈতিক শক্তি গড়ে উঠেছে।
মস্কো সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর কেন্দ্র হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে সরকার, শিল্প ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক কেন্দ্র তৈরি করেছে।
১০. সাংহাই (চীন): চীনের অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র সাংহাই শহরটি প্রায় ৫১৬ বিলিয়ন ডলার জিডিপির সাথে বিশ্বের ১০ ধনী শহরের তালিকায় জায়গা পেয়েছে। এটি বাণিজ্য, ফাইনান্স, আন্তর্জাতিক লগ্নি এবং প্রযুক্তি ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান কেন্দ্র। সাংহাই একদিকে চীনের দ্রুত বর্ধিত অর্থনীতির প্রতিফলন, অন্যদিকে এটি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও বাণিজ্য শৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবেও বিবেচিত হয়।
শীর্ষ ১০ ধনী শহরের তালিকায় স্পষ্ট যে বিশ্ব অর্থনীতির প্রধান কেন্দ্রগুলো মূলত উন্নত শিল্প, আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও বিনিয়োগ, ফাইনান্স, প্রযুক্তি, উৎপাদন এবং বড় জনসংখ্যার সমন্বয়ে গঠিত। এ ধরনের শহরগুলো কেবল নিজ দেশে নয়, পুরো বিশ্বে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, ব্যবসা বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এছাড়া এই ধনী শহরগুলোর অর্থনৈতিক প্রভাব বিশ্বব্যাপী ফাইনান্স, বাণিজ্য ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও বিশাল। এগুলো আন্তর্জাতিক কর্পোরেট, ব্যাংকিং, শিল্প প্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রধান আকর্ষণীয় কেন্দ্র।
বিশ্বমানে ধনী শহরগুলো শুধু আয় বা জিডিপি‑এর পরিমাণে বড় নয়; এগুলো আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক প্রবাহের কোলাহলে কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে যেখানে বিনিয়োগ হয়, নতুন ব্যবসার সম্ভাবনা তৈরি হয় এবং বৈশ্বিক মানচিত্রে অর্থনৈতিক শক্তির অবস্থান স্পষ্ট করে।
Posted` ৫:২১ অপরাহ্ণ | শনিবার, ২৮ মার্চ ২০২৬
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: ই-মেইল: bankbima1@gmail.com